ডিজিটাল মুদ্রা চালু হতে যাচ্ছে ইউরোজোনে

বিশ্বজুড়ে নগদে লেনদেন দ্রুত কমছে, যার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে ইউরোজোনেও।

বিশ্বজুড়ে নগদে লেনদেন দ্রুত কমছে, যার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে ইউরোজোনেও। এ অঞ্চলে ক্রমেই কার্ড, স্মার্টফোন ও অ্যাপের মাধ্যমে লেনদেন বাড়ছে। এমন পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে নতুন ব্যবস্থা নিতে যাচ্ছে ইউরোপিয়ান সেন্ট্রাল ব্যাংক (ইসিবি)। এ জন্য ইউরোজোনে ডিজিটাল মুদ্রা চালুর প্রক্রিয়া শুরু করেছে ইসিবি, যাকে মুদ্রা সার্বভৌমত্ব টিকিয়ে রাখার পন্থা হিসেবে দেখছেন ইউরোজোনের নীতিনির্ধারকরা। তবে এ মুদ্রা পুরোপুরি চালু হতে সময় লাগতে পারে দুই থেকে চার বছর। খবর ইউরো নিউজ।

প্রতিবেদন অনুসারে, নগদ অর্থের মতো ব্যবহার করা যাবে ইসিবি প্রবর্তিত ডিজিটাল ইউরো। গত মাসে ইসিবির নির্বাহী বোর্ডের সদস্য পিয়েরো সিপোলোনে বলেন, ‘ডিজিটাল ইউরো জারির প্রধান কারণ হলো ডিজিটাল যুগে নগদের সুবিধা সংরক্ষণ করা।’

সাধারণত সহজ, ব্যক্তিগত ও সর্বজনীনভাবে গ্রহণযোগ্য লেনদেনের মাধ্যম হলো নগদ। এর জন্য ব্যাংক অ্যাকাউন্টের প্রয়োজন নেই। নেই কোনো লুকানো ফি। গ্রাহক কোথায় অর্থ খরচ করছেন, সে ডাটা ব্যাংক বা প্রযুক্তি কোম্পানি কেউই সংরক্ষণে রাখে না। এর বিপরীতে বেশির ভাগ ডিজিটাল পেমেন্টের মাধ্যম হলো বেসরকারি কোম্পানি। কার্ড ব্যবহার সহজ হলেও তা বাণিজ্যিক সিস্টেমের অংশ। প্রতিটি লেনদেন হয় বেসরকারি নেটওয়ার্কের মাধ্যমে, যা তথ্য ট্র্যাক করার পাশাপাশি নির্দিষ্ট অংকের ফি কেটে নেয়। এক্ষেত্রে নিজ অঞ্চলের বাইরের অনেক সিস্টেমের ওপর নির্ভরশীল ইউরোপ।

পিয়েরো সিপোলোনে বলেন, ‘ইউরোপে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, নগদ লেনদেন কমার ফলে যে শূন্যতা তৈরি হচ্ছে তা বিদেশী বেসরকারি পেমেন্ট সিস্টেমের মাধ্যমে পূরণ হচ্ছে।’

তিনি জানান, ডিজিটাল ইউরো অফলাইন ও অনলাইন দুই ক্ষেত্রেই উচ্চমাত্রার গোপনীয়তা নিশ্চিত করবে। এটি একটি পাবলিক অবকাঠামো যা বিনামূল্যে ব্যবহারযোগ্য, সর্বত্র গ্রহণযোগ্য ও নিরপেক্ষ।

পিয়েরো সিপোলোনে এমন ইঙ্গিতও দেন, যদি ডিজিটাল ইউরো না আসে, তাহলে ইসিবি নিজ অঞ্চলে দৈনন্দিন লেনদেনে নিজেদের মূখ্য ভূমিকা হারাবে।

২০১৯-২৪ সালের মধ্যে ইউরো অঞ্চলে নগদ ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। পরিমাণে ৬৮ থেকে কমে হয়েছে ৪০ শতাংশ। অন্যদিকে অর্থমূল্য হিসাবে ৪০ থেকে কমে নেমে এসেছে ২৪ শতাংশে।

ইউরো কর্তৃপক্ষ বলছে, ডিজিটালে বৃদ্ধি ও নগদে লেনদেন কমার সঙ্গে সঙ্গে ইউরোপের অর্থনৈতিক অবকাঠামোর অনেকটাই বেসরকারি কোম্পানি ও বিদেশী প্লাটফর্মের নিয়ন্ত্রণে চলে যাচ্ছে। এটি মুদ্রার সার্বভৌমত্বের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। তাই পাবলিক ডিজিটাল পেমেন্ট অপশন ছাড়া অর্থের প্রবাহে নিয়ন্ত্রণ হারানোর ঝুঁকি নিয়ে চিন্তিত ইসিবি।

অবশ্য ইউরোপে এখনো অনেক ছোট ব্যবসা ও ভোক্তা নগদ পছন্দ করে। কিছু দেশে এ প্রবণতা বাড়ছে। গোল্ডম্যান স্যাকসের এক প্রতিবেদন অনুসারে, ইউরোজোনের প্রায় ৩০ শতাংশ ছোট ও মাঝারি ব্যবসা নগদ পছন্দ করে, এ সংখ্যা অস্ট্রিয়ায় ৫০ শতাংশের বেশি এবং ইতালিতে প্রায় ৪০ শতাংশ। তবে সতর্ক করে গোল্ডম্যান স্যাকসের অর্থনীতিবিদ ফিলিপ্পো তাদ্দেই বলেন, ‘বর্তমান বিভাজিত পেমেন্ট পরিবেশে যদি পাবলিক ডিজিটাল মুদ্রা না থাকে, ইউরোর তারল্য ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।’

আরেকটি বিষয় হলো ডিজিটাল ইউরো অফলাইনেও কাজ করবে, যা কিনা প্রাকৃতিক বিপর্যয় বা বিদ্যুৎ বিভ্রাটের মতো জরুরি পরিস্থিতিতে হতে পারে নিরাপদ পেমেন্ট পদ্ধতি। ব্যবহারকারীরা ডিজিটাল ওয়ালেটের মুদ্রাটির নাগাল পাবেন, যেখানে কার্ড ট্যাপ করার সহজ অপশন থাকবে।

ইসিবি জানিয়েছে, ডিজিটাল ওয়ালেট এখনো প্রস্তুতি পর্যায়ে রয়েছে। আগামী অক্টোবর পর্যন্ত এ প্রস্তুতি চলবে। এরপর পদ্ধতিটি এগিয়ে নেয়া হবে কিনা সে সিদ্ধান্ত নেবে ইউরোজোনের গভর্নিং কাউন্সিল। সব অনুমোদন মিললেও ডিজিটাল ওয়ালেট ডাউনলোডের সুযোগ মিলতে পারে ২০২৭-২৯ সাল নাগাদ।

প্রশ্ন উঠেছে, ডিজিটাল এ মুদ্রা ডলারের প্রাধান্যকে চ্যালেঞ্জ করবে কিনা। তবে ইসিবির সাফ বক্তব্য হলো, ভূরাজনৈতিক বা বর্তমান বিশ্ব আর্থিক ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করার পরিকল্পনা নেই তাদের। পিয়েরো সিপোলোনে বলেন, ‘এটি খুচরা পেমেন্ট টুল মাত্র যা শুধু ইউরোপীয়দের, আন্তর্জাতিক রিজার্ভ হোল্ডারদের জন্য নয়।’

আরও